রেল দুর্নীতির ১০ উৎস চিহ্নিত দুদকের, প্রতিরোধে ১৫ সুপারিশ

বাংলাদেশ

রেলওয়ের জলাশয়-পুকুর ইজারা, যন্ত্রপাতি কেনাকাটা, নিলাম, টিকিট কালোবাজারি, জমি দখলসহ অনেক দুর্নীতির তথ্য-উপাত্ত উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে। রেলওয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী বহিরাগত দালাল ও সিন্ডিকেটের সঙ্গে আঁতাত করে বছরের পর বছর রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগে এই দুর্নীতি করে যাচ্ছে।
দুদকের অনুসন্ধানে রেলওয়ের দুর্নীতির ১০টি উৎস চিহ্নিত করে এসব দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে ১৫টি সুপারিশ করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিমের পর্যবেক্ষণ’ প্রতিবেদনটি রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজনের কাছে হস্তান্তর করেন দুদক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান।

প্রতিবেদনটি হস্তান্তরের পর দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান বলেন, বিভিন্ন সেক্টরের দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধে পৃথক ২৫টি প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করে দুদক। কমিশন ১২টি প্রতিবেদন এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করেছে। রেলওয়ের প্রতিবেদনে দুর্নীতির ১০টি উৎস চিহ্নিত করে ওই সব দুর্নীতি বন্ধে বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে। এ প্রতিবেদন কোনো বিশেষজ্ঞ মতামতসংবলিত প্রতিবেদন নয়। এটি কমিশনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি টিমের প্রতিবেদন। টিম বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে।

১০ দুর্নীতির উৎস

১. বাংলাদেশ রেলওয়ে (পূর্বাঞ্চল) চট্টগ্রাম এবং (পশ্চিমাঞ্চল) রাজশাহীর অধীনে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি লিজের নামে হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পেয়েছে দুদক। জালিয়াতি করে অনেক জলাশয় ও পুকুর লিজ দিলেও রাজস্ব আদায় হয় না ঠিকমতো। অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে রেলওয়ের জমিতে স্থাপনা নির্মাণ করতে দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি

কোটি টাকা। তদারকি আর মনিটরিংয়ের অভাবে রেলওয়ের শত শত একর ভূমি বেদখল হয়ে আছে।

যারা এসব উদ্ধার করবে সেই রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দখলেই আছে রেলওয়ের শত শত একর জমি।

২. রেলের কেনাকাটায় চলছে লাগামহীন দুর্নীতি। ওয়াগন, কোচ, লোকোমোটিভ, ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ডিএমইউ) ক্রয় এবং সংগ্রহে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম চলছে।

৩. রেলওয়ের বিভিন্ন সেকশনের স্টেশনের সিগন্যালিং ব্যবস্থা পুনর্বাসন ও আধুনিকীকরণ কাজেও হচ্ছে অনিয়ম ও দুর্নীতি।

৪. রেলওয়ের ডাবল লাইন, সিঙ্গল লাইন ডুয়াল গেজ ট্র্যাক নির্মাণকাজে বিরামহীনভাবে হচ্ছে দুর্নীতি।

৫. রেলওয়ের জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত কাজে সিন্ডিকেট করে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে।

৬. রেলওয়ের বিজি ও এমজি যাত্রীবাহী ক্যারেজ পুনর্বাসন নিলামে যন্ত্রাংশ বিক্রির ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিয়ম করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা

৭. ওয়ার্কশপগুলো কার্যকরী না করে আমদানির মাধ্যমে বিভিন্নভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে। স্লিপার কারখানা অকার্যকর রেখে সরকারের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতিসাধন করছে একটি চক্র।

৮. রেলওয়ের টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত রেলওয়ের অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী সিন্ডিকেট। দালালদের মাধ্যমে ট্রেনের বেশির ভাগ টিকিট কেনার মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, কালোবাজারে অধিক মূল্যে টিকিট বিক্রি করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

৯. যাত্রীবাহী ট্রেন ইজারা দেওয়ার মাধ্যমেও চলছে হরিলুট। কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না জনগণ।

১০. রেলওয়ের খাবারের মান খুবই নিম্নমানের, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তদারকি ও মনিটরিংয়ের অভাবে খাবারের দামও নিচ্ছে বেশি।

দুর্নীতি প্রতিরোধে ১৫ সুপারিশ

১. আইবিএ, বুয়েট, বিএমসির সহযোগিতায় রেলওয়ের বিভিন্ন পদে লোক নিয়োগের ব্যবস্থা করা। নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যেতে পারে এবং কম সময়ের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। ২. রেলওয়ের বিভিন্ন প্রকার কেনাকাটায় প্রতিযোগিতামূলক প্রকাশ্য এবং ই-টেন্ডারিংয়ের মাধ্যমে যোগ্য প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিকে কার্যাদেশ দেওয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। দরপত্র প্রক্রিয়ায় পিপিআর অনুযায়ী পরামর্শক নিয়োগে বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা। ৩. রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসভবন এবং অফিস স্থাপনার সম্পত্তিগুলো ডিজিটাল ডাটা এন্ট্রির মাধ্যমে তালিকা প্রস্তুত করাসহ অবৈধভাবে দখল করা সম্পত্তি রেলওয়ের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে আনা। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ ও দক্ষ আইনজীবী প্যানেল গঠন করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। রেলওয়ের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা। ৪. সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার উৎকর্ষ সাধনে একটি ডাটা বেইস তৈরি করা। ওই ডাটা বেইসে অবৈধ দখলদারদের দখলে রয়েছে এমন সম্পত্তির তালিকা তৈরি করে সে তথ্য অনুযায়ী দখলদারদের উচ্ছেদ করতে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা। পরবর্তী সময়ে উদ্ধার করা সম্পত্তি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এনে তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনে একটি সেল গঠন করা। ৫. রেলওয়ের ওয়ার্কশপ ও স্লিপার কারখানাগুলো সচল ও কার্যকরী করা। ৬. কোচ আমদানি নিরুৎসাহ করে নিজস্ব কারখানায় কোচ নির্মাণ করার সক্ষমতা তৈরি করা। ৭. একচেটিয়া ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণে পিপিএ ও পিপিআর অনুসরণ করা। ৮. বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন লাইন নির্মাণ এবং সংস্কারকাজ তদারকির ব্যবস্থা করা। ৯. অডিট কার্যক্রম জোরদার করা এবং অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা। ১০.পিপিআর অনুযায়ী স্বচ্ছতার সঙ্গে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে রেলওয়ের পুরনো মালামাল বিক্রির ব্যবস্থা করা। ১১. টিকিট কালোবাজারি বন্ধ করতে টিকিট বিক্রিতে ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া। ১২. রেলওয়েতে পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠাকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা ১৩. আধুনিকায়নের মাধ্যমে যাত্রীসেবা বাড়ানো, বিশেষ করে নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী রেল চলাচল নিশ্চিত করা। পাশাপাশি যাত্রীর নিরাপত্তা ও মালামাল পরিবহনে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। ১৪. রেলে সরবরাহ করা খাবার স্বাস্থ্যসম্মত করার ক্ষেত্রে রেলওয়ের পরিচালকের (গার্ড) নেতৃত্বে একটি তদারকি ব্যবস্থা গড়া। ১৫. রেলওয়ের কাজ স্বয়ংক্রিয় (অটোমেশন) পদ্ধতির আওতায় আনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *