মিন্নির কারামুক্তিতে আর বাধা নেই

বাংলাদেশ

বরগুনায় প্রকাশ্য দিবালোকে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফের স্ত্রী কারাবন্দি আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগের অবকাশকালীন চেম্বার বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। মিন্নির জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের ওপর শুনানি শেষে গতকাল সোমবার ‘নো অর্ডার’ বলে আদেশ দেন আদালত। এই আদেশের পর আইনজীবীরা বলেছেন, এখন আর মিন্নির কারামুক্তিতে বাধা নেই।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি (মিন্নির জামিনের জন্য আদালতে শুনানিও করেছেন তিনি)  বলেন, চেম্বার জজ আদালতের আদেশের পর মিন্নির কারামুক্তিতে বাধা নেই। তিনি বলেন, তবে মামলায় মিন্নিকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করায় জামিনে থেকেই তাঁকে আইনগতভাবে মামলাটি মোকাবেলা করতে হবে।

এদিকে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি চেয়ে লিভ টু আপিল আবেদন দাখিল করবে রাষ্ট্রপক্ষ। হাইকোর্টের রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পরই এ আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জাহিদ সারোয়ার কাজল। তিনি বলেন, আগামীকাল (মঙ্গলবার) রায়ের কপি পাওয়া গেলে এই লিভ টু আপিল আবেদন দাখিল করা হবে। এরই মধ্যে আপিল করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে যদি মিন্নি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে যান সে ক্ষেত্রে তাঁকে গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণের নির্দেশনা চাওয়া হবে।

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২৯ আগস্ট এক রায়ে মিন্নির জামিন মঞ্জুর করেন। এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ মিন্নির জামিন স্থগিত চেয়ে চেম্বার বিচারপতির আদালতে আবেদন করে। গতকাল এ আবেদনের ওপর শুনানি হয়। মিন্নির পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন, জেসমিন

সুলতানা, আইনুন্নাহার সিদ্দিকা, মাক্কিয়া ফাতেমা ইসলাম, জামিউল হক ফয়সল প্রমুখ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জাহিদ সারোয়ার কাজল ও মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পী।

গতকাল শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বলা হয়, এরই মধ্যে এই মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। তাতে মিন্নিকে আসামি করা হয়েছে। তালিকায় ৭ নম্বরে মিন্নির নাম রয়েছে। তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মিন্নির জবানবন্দি পাঠ করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের বিরোধিতা করে মিন্নির আইনজীবীরা বলেন, ১৯ বছরের একটি মেয়ে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ১৬ জুলাই পুলিশ লাইনসে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে বেশ কয়েক ঘণ্টা রাখার পর রাতে ১০টার পর গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এর পরদিন ১৭ জুলাই তাঁকে আদালতে নিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ডে নিয়ে পুলিশ লাইনসে রাখা হয়। আইনজীবীরা বলেন, আইন অনুযায়ী আইনজীবীর উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা। কিন্তু তা করা হয়নি। একজন তরুণীকে এত ঘণ্টা পুলিশের হেফাজতে রাখা হলে এমনিতেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কথা। তা ছাড়া তাঁকে আদালতে হাজির করার পর তিনি বলেছিলেন, ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। এমনকি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার পরও তিনি এই জবানবন্দি প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করেছেন। তাঁরা বলেন, ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে যে একজন আসামি স্বেচ্ছায় এত গুছিয়ে এত কথা বলতে পারে না।

গত ২৬ জুন সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে কুপিয়ে রিফাত শরীফকে হত্যা করে। এ ঘটনায় নিহত রিফাতের বাবা আব্দুল আলিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে মামলা করেন। এই মামলার মিন্নি, রিফাত ফরাজী, টিকটক হৃদয়সহ ১৫ জনকে আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া এজাহারভুক্ত নয়ন বন্ড ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। গত ১৬ জুলাই রাতে গ্রেপ্তার করে পরদিন ১৭ জুলাই মিন্নিকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ড শেষ হওয়ার আগেই গত ১৯ জুলাই ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন মিন্নি। এরপর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগের দিন ১৮ জুলাই দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করেন বরগুনার এসপি মারুফ হোসেন। এ অবস্থায় প্রথমে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ও পরে জেলা জজ আদালতে মিন্নির জামিনের আবেদন করা হলেও ওই দুই আদালতে তাঁর জামিনের আবেদন খারিজ হয়। এরপর হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করা হয়। হাইকোর্ট মিন্নির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির আগেই এসপির সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে আদালত মিন্নির জামিন মঞ্জুর করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *