মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি নিম্নমানের মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক

স্বাস্থ্য

মিথ্যা ঘোষণায় নিম্নমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক আমদানি করছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। শহরের পাড়া-মহল্লা ও উপজেলা পর্যায়ের ওষুধের দোকানে তুলনামূলক কম দামে এসব ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। অবৈধ এ কারবারের মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীরা মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিলেও প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

গত অর্থবছরে নিম্নমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের ১১টি চালান আটক করেছেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। মিথ্যা ঘোষণায় আমদানীকৃত পণ্য সম্পর্কে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. শহীদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি বন্ধে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর কঠোর নজরদারি করছে। এরই ধারবাহিকতায় বেশির ভাগ পণ্যের চালানের কার্টনের মধ্যে কী আছে তা যাচাই করে দেখা হচ্ছে। বিশেষভাবে কার্টনে ঘোষণামতো পণ্য আছে কি না তা দেখা হচ্ছে। এভাবে যাচাই করতে গিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় আনা মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের অ্যান্টিবায়োটিকের একাধিক চালান আটক করা হয়েছে। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এ অবৈধ কারবার করছে।’

এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে প্রতিটি বন্দরে স্ক্যানিং যন্ত্র ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি এ যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর পণ্য দেশে প্রবেশ করা সম্ভব হবে না।’

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে আদালতের নির্দেশ অমান্য করে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই অ্যান্টিবায়েটিক বিক্রি করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোরিয়া, তাইওয়ান, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মিথ্যা ঘোষণায় মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের ওষুধ বেশি আমদানি করা হচ্ছে। দেশের অসাধু ব্যবসায়ীরা একাধিক বিদেশি চক্রের সহযোগিতা নিয়ে অবৈধ ওষুধের এ কারবার করে থাকে। সুকৌশলে এসব ওষুধ আমদানি করা হচ্ছে, যে কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নজরদারিতে চালান ধরা পড়লেও প্রকৃত আমদানিকারকদের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত এক বছরে মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের অ্যান্টিবায়োটিকের ১১টি চালান ধরা পড়েছে। এসব চালানের কার্টনের সঙ্গে থাকা কাগজপত্রে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল, জরুরি পণ্য—এসব লেখা ছিল। বিভিন্ন বন্দর দিয়ে আমদানিকালে এসব চালান আটক করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আটক করা হয়েছে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর দিয়ে আমদানিকালে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তে দেখা গেছে নিম্নমানের বা মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক বন্দর থেকে ছাড় করে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা জানে না কার বা কাদের হয়ে মাল বহন করছে। তারা ভাড়া করা গাড়িতে করে পণ্যের চালান পৌঁছে দিয়ে থাকে। এ কাজে তারা চার হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকে। শুল্ক গোয়েন্দারা এ পর্যন্ত পাঁচ ব্যক্তিকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তবে তারা প্রকৃত মালিককে চেনে না বলে জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আমদানি করা নিম্নমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের মূল্য পরিশোধ করা হয় ব্যাংকিং চ্যানেলে। চালান বন্দর থেকে ছাড় করিয়ে গাজীপুর, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, পুরান ঢাকা, সাভারের বিভিন্ন বাসাবাড়ি ভাড়া করে মজুদ করে রাখা হয়। এসব বাসাবাড়িতে অভিযান চালিয়েও এমন পণ্য আটক করা হয়েছে। এখানে পাহারাদার হিসেবে এক বা দুজন থাকছে। তারাও এসব পণ্য সম্পর্কে কিছুই জানে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অসাধু ব্যবসায়ীরা মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিম্নমানের অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করার জন্য নামিদামি দোকানে যায় না। তারা শহরের পাড়া-মহল্লা ও উপজেলা পর্যায়ের দোকানে সরবরাহ করে। তারা নিজস্ব লোক দোকানে দোকানে পাঠিয়ে আগ্রহী দোকান মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করে রাখে। এরপর সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা হয়।

চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়েটিক বিক্রি

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালতের নির্দেশে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়েটিক বিক্রি নিষিদ্ধ করা হলেও তা মানছে না অনেক বিক্রেতা। এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে  প্রতিবেদক ক্রেতা সেজে বিভিন্ন দোকানে যান। দেখা গেছে, বিক্রেতারা চহিদামতো অ্যান্টিবায়েটিক বিক্রি করছে।

গত ১৭ জুলাই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (হাসপাতাল ভবন-২) গিয়ে দেখা যায়, ওয়েল বিয়িং ফার্মেসি নামের একটি দোকানে ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই এজিথ, জিম্যাক্স, সেফোটিল, ম্যাক্সিভেকসহ বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। এই ফার্মেসির পাশের এ কে এস ফার্মেসিতে এক পাতা জিম্যাক্স অ্যান্টিবায়েটিক চাইলে নয়ন শীল নামের এক কর্মী এনে দেন। একই দিনে ভাটারা থানা এলাকার সরকার মার্কেটের টি টি ফার্মা নামের একটি দোকানে সেফোটিল চাইলে ব্যবস্থাপত্র দেখতে না চেয়ে বিক্রি করা হয়। চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকায় কর্ণফুলী ফার্মেসিতে ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই অ্যান্টিবায়েটিক ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কেন অ্যান্টিবায়েটিক বিক্রি করা হচ্ছে জানতে চাইলে দোকানি রওশন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কত অনিয়ম হচ্ছে। আমার ভুল কেন ধরতে এসেছেন। আমরা এভাবেই বিক্রি করি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *