মাদকাসক্ত ছেলের শিকলে বাঁধা জীবন!

জেলা খবর

পুরো গায়ে ময়লার স্তর। অন্ধকারাচ্ছন্ন স্যাঁতসেঁতে ঘর। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ভাত। ঘরটিতে ঢোকা মাত্রই নাকে লাগে বোঁটকা গন্ধ। এই ঘরে চলে খাওয়াদাওয়া, আবার এই ঘরেই চলে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া। এমন এক দুর্বিষহ পরিবেশেই সাতটি বছর ধরে শিকলে বন্দি ২২ বছরের যুবক মো. মিজানুর রহমান। তাঁর এই করুণ পরিণতি ডেকে এনেছে সর্বনাশা মাদক।

এই যুবকের ঘরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেই শোনা যায়, রাস্তার লোকজনকে উদ্দেশ করে যুবকটি আকুল কণ্ঠে বলছে, ‘ছেলে মনে করে আমার শিকলটা খুলে দেন না! ভাই মনে করে আমার শিকলটা খুলে দেন না!’ এভাবে করুণ কণ্ঠে নানা কাকুতি মিনতি করেন মিজান, কিন্তু কেউ শোনে না তাঁর অনুনয়।

এভাবেই কৈশোর থেকে যৌবনে এসে পড়েছেন মিজান, কিন্তু তাঁর মুক্তি কবে কেউ জানে না। ছেলের আকুতি-মিনতি শুনে মিজানের মা-বাবারও বুক ভেঙে যায়, কিন্তু মাদকাসক্ত ছেলেকে মুক্ত করে দিলে কখন কী কাণ্ড করে বসে, সেই চিন্তায় ঝুঁকি নিতে চান না তাঁরা।

জানা গেছে, কিশোর বয়সে অন্য দশটা ছেলের চেয়ে আলাদা ছিলেন মিজান। ধর্মকর্ম ছাড়াও সব ধরনের অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং প্রতিবেশীদের নানা কাজে নিজেকে বিলিয়ে দিতেন। কিন্তু সঙ্গদোষে হঠাৎ মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন তিনি। মা-বাবাকে মারধর ছাড়াও এলাকাবাসীর কাছে হয়ে ওঠেন এক যন্ত্রণার নাম।

হতভাগ্য যুবক মিজানুর রহমান ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার মুসল্লী ইউনিয়নের কাউয়ারগাতির মো. নুরু মিয়ার একমাত্র ছেলে।

এই পরিবারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি রিকশাভ্যানের চালক নুরু মিয়ার কোনো মতে নুনেভাতে কাটে জীবন। ছেলের চিকিৎসার চিন্তা তাঁদের কাছে বিলাসিতার সমান। তাই বৃদ্ধ মাকেই ছেলের খাওয়ানো থেকে শুরু করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার যাবতীয় কাজ করতে হয়। তিনি চোখ বুজলে ছেলের কী হবে, তা ভেবে চোখের পানি ফেলেন।

মা হেলেনা বেগম জানান, ছেলে যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে তখন থেকেই এলাকায় ছিল এক চঞ্চল ও সচ্চরিত্রের আলোচিত মিজান। তাকে নিয়ে গর্ব করা যেত। হঠাৎ তার আচরণ অন্য রকম লক্ষ করা গেলে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো উপক্রম হয়। নিয়মিত স্কুলে যায় না। উচ্ছৃঙ্খল আচরণসহ সব ক্ষেত্রেই সে হয়ে ওঠে বিতর্কিত। পাড়ার বাজে ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা ছাড়াও কোনো কোনো রাত বাড়ির বাইরেও থাকত। এ অবস্থায় মারাত্মক বেপরোয়া হয়ে ওঠে মিজান। আসক্ত হয়ে পড়ে বিভিন্ন ধরনের মাদকে। এর পর থেকে মাদকের জন্য চাহিদামতো টাকা না দিলেই হয়ে উঠত পাগলপ্রায়। ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর ছাড়াও পরিবারের অনেককেই মারধর করত। এ অবস্থায় কোনো ধরনের গতি করতে না পেয়ে মিজানের ১৫ বছর বয়সে থানার আশ্রয় নেওয়া হয়।

বাবা নুরু মিয়া জানান, থানা-পুলিশ তখন মাদকের একটি মামলায় অভিযুক্ত করে মিজানকে আদালতে পাঠায়। সেখানেই ছয় মাস অবস্থানের পর জামিনে মুক্ত করা হয়। কিন্তু বাড়িতে এসে কিছুদিন পর আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যান। তখন মাত্রাতিরিক্ত বেপরোয়া আচরণের প্রতিবাদ করতে গেলে মিজান তাঁর মা হেলেনা বেগমকে দা দিয়ে কুপিয়ে আহত করেন। একপর্যায়ে নিরাপত্তাহীনতার কারণেই শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার পরিকল্পনা করা হয়। আর এই অবস্থায় চলছে গত সাত বছর।

গত শুক্রবার ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর দেখা যায়, বাড়ির সামনে চাচার একটি ঘরের বারান্দার অন্ধকারাচ্ছন্ন ছোট কক্ষে একটি চৌকিতে বসে আছেন মিজানুর রহমান। মাথার ওপর ময়লাযুক্ত ছেঁড়া একটি মশারি। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে পুরো কক্ষে। স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ভাত। পাশেই একটি জানালা ঘেঁষে বসে রয়েছেন মিজান। এ প্রতিনিধিকে দেখেই বলে ওঠেন, ‘স্যার, আমার কি মান-ইজ্জত নাই। এরা (মা-বাবা) কি কামডা ভালা করতাছে? আমি তো ভালা, তার পরও বাইন্দা রাখছে কেরে? আমার শিকলডা খুইল্যা দেইন। আমি কথা দিতাছি, কিছুই খাইয়াম না।’

এ সময় কাছে গিয়ে দেখা যায়, পুরো শরীরে ময়লার স্তর পড়ে আছে। মাথার চুল, গোঁফ ও দাড়ি এলোমেলো। মুক্ত স্থানে যাওয়ার জন্য ছটফট করছেন। বাড়ির সামনের পথ দিয়ে যাওয়া পথচারীদের ডেকে অনুরোধ করছেন তাঁর পায়ে তালাবদ্ধ শিকল খুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কেউ তাঁর কথা শুনছে না। এত দিনেও কেউ হাত বাড়িয়ে দেয়নি তাঁকে উদ্ধারে। মা-বাবা প্রতিদিন ছেলের আকুতি শুনছেন, কিন্তু কান্না ছাড়া তাঁদের আর কিছুই করার নেই। কারণ ছেড়ে দিলেই যেকোনো ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে মাদকাসক্ত ছেলে।

মা হেলেনা বেগম আরো জানান, নেশার জন্য যখন চিৎকার করে তখন বাধ্য হয়ে বাজার থেকে বিড়ি এনে নিজেই ছেলের হাতে তুলে দেন। এতে ছেলের উচ্ছৃঙ্খল আচরণের হাত থেকে সাময়িক রেহাই পান। এ অবস্থায় তাঁর প্রশ্ন, এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি কবে মিলবে?

এলাকার সমাজসেবক আতাউর রহমান বাচ্চু বলেন, তিনি এই পথ দিয়ে একদিন যাওয়ার সময় জানালা দিয়ে ছেলেটির আকুতির শব্দ পেয়ে কাছে যান। তখন ছেলেটির প্রশ্ন ছিল, ‘আপনার কি ছেলে নাই? আমারে কি ছেলে মনে করে শিকলডা খুইল্যা দিতে পারেন না?’ এর পর থেকে সমাজসেবক আতাউরের কাছে নিজেকে অপরাধী বলে মনে হচ্ছে। তিনি ছেলেটিকে উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য প্রশাসন ও বিত্তবানদের দৃষ্টি কামনা করছেন।

এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোসাদ্দেক মেহদী ইমাম বলেন, ওই যুবককে শিকলে বাঁধা থেকে মুক্ত করে উপজেলা সমাজকল্যাণ কার্যালয়ের রোগীকল্যাণ তহবিল থেকে অর্থ সহযোগিতায় মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *