মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রে অর্থায়ন বন্ধে জাপানকে ১৮ দেশের ৪৪ সংগঠনের চিঠি

বাংলাদেশ

মোঃ সাহাব উদ্দিন কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধিঃ কক্সবাজারের মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজে অর্থায়ন না করার জন্য জাপান সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে ১৮ দেশের ৪৪টি নাগরিক ও জলবায়ু আন্দোলন সংগঠন।

বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ বিষয়ক কর্মজোট গত বৃহস্পতিবার ই মেইলে পাঠানো এক চিঠিতে এ দাবি জানায়। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিতসু মোটেগি এবং জাইকা প্রেসিডেন্ট শিনিচি কিটায়োকার কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্পে মানবাধিকার লঙ্ঘন, স্থানীয় পরিবেশ বিপর্যয়সহ নানা বিষয়ে উদ্বেগ জানানো হয়।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছে থ্রি ফিফটি ডট অরগ, গ্রিনপিস, ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ, এনজিও ফোরাম অন এডিবি, অয়েল চেঞ্জ ইন্টারন্যাশনাল, জ্যাকসেস জাপান, ক্লিন বাংলাদেশ।
চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা (ক্যাপাসিটি) এখন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্থাপিত সক্ষমতার মাত্র ৪৩ শতাংশ ব্যবহৃত হয়েছে এবং এজন্য অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ৯ হাজার কোটি টাকা (১.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারি বিদ্যুতের চাহিদা আরও কমিয়ে দেওয়ায় নতুন করে স্থাপিত যেকোনো নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ তৈরি করবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, করোনাপরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারের ৬৮ হাজার কোটি টাকা (৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) প্রয়োজন, যার অর্ধেকের বেশি বিদেশি দাতা সংস্থার কাছ থেকে পাওয়ার আশা করছে সরকার। এর মধ্যে জাইকার কাছেই সরকার ৮৫০ কোটি টাকা (১ বিলিয়ন ডলার) চেয়েছে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে সম্প্রতি বাংলাদেশের ১১০০ কোটি টাকার (১২৯ মিলিয়ন ডলার) ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পে আরও ওডিএ (অফিশিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিসটেন্স) ঋণ বাংলাদেশের বৈদেশিক দেনাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে, যা দেশের টেকসই উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। অথচ জাপান এদেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম সহযোগী বন্ধু।
উল্লেখ্য, মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পে জাইকা ইতিমধ্যে ১.৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে, এবং আরও ১.৩২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
জাইকার অর্থায়নে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজ হওয়ার কথা রয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, গত এপ্রিলে যখন সারাদেশে লকডাউনের মধ্যে সবকিছু বন্ধ ছিল, মাতারবাড়ী প্রকল্পে কাজ করা তিন হাজার শ্রমিককে কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে বাংলাদেশে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড। এতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। প্রকল্পের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাইকা মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই দায় এড়াতে পারে না। অথচ জাইকার অফিশিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্সের (ওডিএ) গাইডলাইনে মানবাধিকার, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া মাতারবাড়ী প্রকল্পে জমি ও কর্মসংস্থান হারানো মানুষেরা এখনও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও বিকল্প কাজ পায়নি বলে যে অভিযোগ রয়েছে, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছে চিঠিতে সাক্ষরকারী সংগঠনগুলো। তারা বলেছে, জমি অধিগ্রহণের কয়েক বছর পরেও এখনও অনেকে ক্ষতিপূরণ পায়নি, যা জাইকার এনভায়রনমেন্ট ও সোশ্যাল কনসিডারেশনস গাইডলাইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এ বিষয়ে বৈদেশিক দেনা বিষয়ক কর্মজোটের সম্পাদক হাসান মেহেদী বলেন, জাইকা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন সহযোগী। আমরা চাই তারা কয়লা নয়, পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ করুক। তাহলে আমরা যেমন একটি স্বল্প নির্গমনকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারব, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারব। এতে দুই দেশই একসঙ্গে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *