পুলিশ টার্গেটে হামলা রহস্যঘেরা

বাংলাদেশ

রাজধানীতে এক মাসের মধ্যে পুলিশকে লক্ষ্য করে দুটি ককটেল বোমা হামলার ঘটনায় রহস্য তৈরি হয়েছে। এসব হামলার পরই মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নামে কথিত দায় স্বীকার করা হয়েছে। বাংলাদেশে আইএসের কার্যক্রম নেই এবং কথিত দায় স্বীকারের সঙ্গে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা। তবে তাঁরা এও বলছেন, হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষভাবে তৈরি করা ককটেল, যা ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসের (আইইডি) মতোই।

গত রবিবারের ঘটনায় গতকাল সোমবার সন্ত্রাস দমন আইনে পল্টন থানায় মামলা দায়ের করেছে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)। কারা, কেন পুলিশকে টার্গেট করে এই বিস্ফোরণ ঘটায়, তা উল্লেখ নেই মামলায়। কথিত দায় স্বীকারেও কোনো উদ্দেশ্যের কথা নেই। এতে দায় স্বীকার নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশের ভালো কাজে মনোবল ভেঙে দিতে এই হামলা চালানো হচ্ছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন তাঁরা। এক মাসে দুই ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের সব পুলিশ ইউনিটকে সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তদন্তে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ‘শক্তিশালী’ বলে শনাক্ত এসব ককটেল বোমা ছুড়ে মারা হয়নি। এগুলোতে রিমোট কন্ট্রোল বা সুইচের ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলোর সঙ্গে নব্য জেএমবি ও পুরনো জেএমবির ব্যবহৃত হ্যান্ড গ্রেনেডসহ বিভিন্ন ধরনের আইইডির কিছুটা মিল আছে। গত রবিবার রাতে মালিবাগে বিস্ফোরিত বোমাটি আগেই পুলিশের পিকআপ ভ্যানের ভেতরে রাখা হয়। গত মাসে গুলিস্তানে ট্রাফিক পুলিশের পাশে একইভাবে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।

মালিবাগে গাড়িতে বিস্ফোরণে আহত রিকশাচালক লাল মিয়াকে গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দেখতে গিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘মালিবাগ মোড়ে পুলিশের গাড়িতে যে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটেছে, এটি সাধারণ ককটেলের চেয়ে শক্তিশালী। ককটেলটি পুলিশ ভ্যানের পেছনে আগে থেকেই রাখা ছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। জনমনে ভীতি, নৈরাজ্য, অরাজকতা সৃষ্টি করার জন্য কোনো গোষ্ঠী এটি করতে পারে। তবে জঙ্গি সম্পৃক্ততা আছে কি না, এ মুহূর্তে বলা যাবে না।’

সাইট ইন্টেলিজেন্সের দেওয়া তথ্য মতে আইএসের দায় স্বীকারকে উড়িয়ে দিয়ে ডিএমপির কমিশনার বলেন, ‘এই ঘটনা কি জঙ্গিদের, নাকি রাজনৈতিক দলের কেউ ঘটিয়েছে, তা গোয়েন্দারা খতিয়ে দেখছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘পুলিশের মনোবল দুর্বল করার জন্য এ ধরনের অপচেষ্টা করা হচ্ছে, ভীতি তৈরি করা হচ্ছে। আমরা পরিষ্কারভাবে বলি, এ ধরনের কর্মকাণ্ড দিয়ে পুলিশের মনোবল ভেঙে দেওয়া যায় না।’

গতকাল দুপুরে আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে দুস্থদের মধ্যে ঈদবস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে গিয়ে ডিএমপির কমিশনার সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি, এটি একটি ককটেল; কিন্তু ইমপ্রোভাইজড। নরমাল ককটেলের চেয়ে এটি শক্তিশালী ছিল। প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে, এটি গাড়িতে রাখা ছিল।’

গত রবিবার রাত ৯টার দিকে মালিবাগ মোড়ে পাম্পের বিপরীত পাশে ফ্লাইওভারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের পিকআপ ভ্যানে ওই বিস্ফোরণ ঘটে। এতে গাড়িটির কাছে দায়িত্বরত পুলিশের ট্রাফিক পূর্ব বিভাগের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই বা সহকারী সার্জেন্ট) রাশেদা আক্তার বাবলী (২৮), রিকশাচালক লাল মিয়া (৫০) এবং আরেক পথচারী আহত হয়। লাল মিয়া ছাড়া বাকিরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছে। মাথায় আঘাত পাওয়ার কারণে লাল মিয়ার অস্ত্রোপচার হয়েছে। হামলার পরই রবিবার রাতে সাইট ইন্টেলিজেন্স জানায়, আইএস ঘটনার দায় স্বীকার করেছে।

গত ২৯ এপ্রিল রাজধানীর গুলিস্তানে ককটেল বিস্ফোরণে ট্রাফিক পুলিশের একজন ও কমিউনিটি পুলিশের দুই সদস্য আহত হন। কয়েক ঘণ্টা পরই একইভাবে আইএসের নামে দায় স্বীকার করা হয়। ডিএমপির কমিশনার তখনো ঘটনার পর বলেছিলেন, ওই ককটেল বোমা সাধারণ ককটেল বোমা নয়। সেটি ছিল বেশি শক্তিশালী এবং ব্যতিক্রম।

দুই ঘটনায়ই আলামত সংগ্রহ করে তদন্তে কাজ করছে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এবং এর বোম ডিসপোজাল ইউনিট। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা  বলেন, যে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটনা হয়েছে, সেগুলো আগে রেখে দেওয়া হয়। এরপর সার্কিটে বা সুইচের মাধ্যমে ফাটানো হয়। আইইডির প্রযুক্তি হলেও এগুলো নব্য জেএমবির আস্তানায় যে ধরনের পাওয়া গেছে, তেমন নয়। বিস্ফোরক তুলনামূলক শক্তিশালী নয়। মালিবাগের ঘটনায় গাড়ির পেছনের দিকে আগুন ধরে যায়। এতে দাহ্য বিস্ফোরক ব্যবহৃত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুই স্থানের আলামতই মিলিয়ে পরীক্ষা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সিটিটিসির সূত্র জানায়, বোমাগুলো রেখে দূর থেকে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে—এমন আলামত পাওয়া গেছে। মালিবাগেই পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অফিস। ওই অফিসের উল্টো দিকে ফ্লাইওভারের নিচে গাড়ির পার্কিং আছে। এর অনেকটা দূরে রাস্তার উল্টো দিকে এসবির পিকআপ ভ্যানটি দাঁড়িয়ে ছিল। সেটিকে আগে থেকেই অনুসরণ করা হয়েছে। পাশের ভবনগুলো থেকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ নিয়ে কে বা কারা সেখানে বোমা রেখে গেছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) সোহেল রানা মালিবাগের ঘটনার প্রসঙ্গে বলেন, ‘পুলিশ সদর দপ্তর এই বিষয়ে দৃষ্টি রাখছে। সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে করণীয় বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের সব ইউনিটকে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। হামলার বিষয়টি তদন্তাধীন। আইএসের দায় স্বীকারের বিষয়টি দৃষ্টিতে এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত ঘটনার সঙ্গে আইএসের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *