পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিতে করব্যবধান বাড়ানোর দাবি

অর্থনীতি

পার্শ্ববর্তী বা সমঅর্থনীতির যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশের কম্পানির করপোরেট করহার অনেক বেশি। উঠতি অর্থনীতির দেশ হিসেবে বিনিয়োগ বাড়াতে কর কমানো ব্যবসায়ীদের বহু দাবির একটি। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে অর্থনীতির আকার ও পরিধি বাড়লেও আনুপাতিক হারে পার্শ্ববর্তী যেকোনো দেশের পেছনে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার।

দেশের মোট জাতীয় উৎপাদন (জিডিপি) ও বাজার মূলধনের হিসাবে পার্শ্ববর্তী ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে অনেক পেছনেই রয়েছে পুঁজিবাজার। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে এগিয়ে নিতে সরকারের নানা উদ্যোগ থাকলেও হঠাৎ হঠাৎ অস্থিরতায় সামনে এগোনোর বদলে পেছনেই হাঁটছে। বহুজাতিক ও ব্লু-চিপ কম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারী বাড়ছে না, তবে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশে ব্যবসা পরিচালনা করা বহুজাতিক ও বড় কম্পানিকে পুঁজিবাজারে আগ্রহী করতে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কম্পানির কর ব্যবধান আরো বাড়ানো দাবি তাঁদের।

তাঁরা বলছেন, তালিকা ও অতালিকাভুক্ত কম্পানির মধ্যে করহারের ব্যবধান বাড়ানো হলে পুঁজিবাজারে আগ্রহী হবে বহুজাতিক ও বড় বড় কম্পানি। কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আয়ের উৎস তৈরি হবে, যা দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব রাখতে সক্ষম হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কম্পানির কর ব্যবধান ১০ শতাংশ। শেয়ার ছেড়ে পুঁজিবাজার থেকে কোনো কম্পানি মূলধন উত্তোলন করলে ২৫ শতাংশ করপোরেট কর দিতে হয়। অর্থাৎ ১০০ টাকা মুনাফা করলে সরকার রাজস্ব পাবে ২৫ টাকা। আর তালিকাভুক্ত না এমন কম্পানির করহার ৩৫ শতাংশ অর্থাৎ ১০০ টাকা মুনাফায় সরকারকে ৩৫ টাকা কর দিতে হয়।

সরকারের বিদ্যমান করহার হচ্ছে যেকোনো কম্পানির জন্য ৩৫ শতাংশ। ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ৪০ শতাংশ, মার্চেন্ট ব্যাংক ৩৭.৫ শতাংশ, সিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও গুলসহ সকল প্রকার তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারী কম্পানি ৪৫ শতাংশ ও মোবাইল ফোন অপারেটর কম্পানি ৪৫ শতাংশ।

তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ২.৫ শতাংশ কর ছাড় দিয়ে ৩৭.৫ শতাংশ করা হয়েছে। মোবাইল ফোন অপারেটর পুঁজিবাজারে এলে ৫ শতাংশ কর ছাড় দিয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এ এম মাজেদুর রহমান সম্প্রতি এনবিআরে বাজেট প্রস্তাবনা জমা দিয়ে বলেছেন, পুঁজিবাজারে ভালো কম্পানির জোগান বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু দেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে এমন অনেক কম্পানি রয়েছে তবুও তারা পুঁজিবাজারে আসছে না। তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কম্পানির কর ব্যবধান ১০ শতাংশ থেকে আরো বাড়ানো প্রয়োজন। কর ব্যবধান বাড়লে নতুন কম্পানি ট্যাক্স বেনিফিট পেতে পুঁজিবাজারে আসবে, এতে কম্পানি বাড়বে, বাড়বে শেয়ারের জোগানও।

জানা গেছে, বর্তমানে দেশে লক্ষাধিক কম্পানি নিবন্ধিত হলেও তালিকাভুক্তির হার খুবই কম। বছরজুড়ে এক ডজনের মতো কম্পানি পুঁজিবাজারে আসছে, যা খুবই নগণ্য বলে মনে করছে সিএসই।

সম্প্রতি প্রাক-বাজেট আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সিএসইর এক প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশে লক্ষাধিক নিবন্ধিত কম্পানির মধ্যে মধ্যম ও বৃহদায়তন কম্পানি কয়েক হাজার, যার সবই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে কিন্তু তালিকাভুক্ত হয়েছে খুবই কম। পুঁজিবাজারের বাইরে থাকা কম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে কর ব্যবধান ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছে তারা।

এই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সিএসইর যুক্তি তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কম্পানির মধ্যকার করহার বৃদ্ধির মাধ্যমে ভালো কম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হবে। এতে পুঁজিবাজারকে সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি স্বচ্ছ করপোরেট রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার মনে করছে, তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কম্পানির মধ্যে করপোরেট করহার পার্থক্য ১০ শতাংশের পরিবর্তে শতকরা ২০ করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *