নর্থ সাউথের দুই শিক্ষার্থীসহ নব্য জেএমবির ৫ সদস্য গ্রেপ্তার

বাংলাদেশ

রাজধানীর ভাটারা থানাধীন বারিধারা আবাসিক এলাকা থেকে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির একটি ‘উলফ প্যাক’-এর পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগ (সিটিটিসি)। তাঁরা হলেন শিবলী শাহাজাদ ওরফে সাদী, শাহ এম আসাদুল্লাহ মর্তুজা কবীর ওরফে আবাবিল, মাশরিক আহমেদ, আশরাফুল আল আমীন ওরফে তারেক ও এস এম তাসনিম রিফাত। এঁদের মধ্যে শিবলী শাহাজাদ ওরফে সাদী ও মর্তুজা কবীর বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

এ ছাড়া মাশরিক বিবিএ শেষ করেছেন যশোর এমএম কলেজ থেকে, যশোরের উপশহর ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতকে পড়েছেন তাসনিম রিফাত এবং শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেছেন আশরাফুল আল আমীন। এঁদের মধ্যে আসাদুল্লাহ মর্তুজার পরিবার সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছে, গত ২৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শেষে আসাদুল্লাহ যশোরে তাঁদের বাড়িতে আসার জন্য বাসের টিকিট কিনতে যান। সেখান থেকে কলাবাগানে তাঁর চাচার বাসায় ফেরার পথে গ্রিন রোড থেকে তাঁকে সাদা পোশাকের লোকজন তুলে নেয়। এ ঘটনায় কলাবাগান থানায় একটি জিডি করা হয়। আর যশোর থেকে গত ৩১ জুলাই তুলে নেওয়া হয় মাশরিককে। বাকি তিনজনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে গত দুই দিনে এঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে তুলা দিয়ে পেঁচানো অবস্থায় ১০টি ডেটোনেটর, চারটি গ্যাসের বোতল ও পাঁচটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।

এ বিষয়ে গতকাল ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা নব্য জেএমবির একটি ‘উলফ প্যাকের’ সদস্য। জঙ্গিবাদে কেউ একাকী উদ্বুদ্ধ হলে তাকে ‘লোন উলফ’ বলে। আর এই সংখ্যা যখন এক থেকে পাঁচজন বা তারও অধিক হয় তখন তাকে উলফ প্যাক বা প্যাক অব উলফ বলা হয়। তাঁরা দেশের ও বিদেশের কিছু সন্ত্রাসী সংগঠনের অনলাইন প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পুলিশকে টার্গেট করে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে সলাপরামর্শ করার জন্য বারিধারার একটি বাসায় একত্রিত হয়েছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকেই ‘এনক্রিপটেড অ্যাপ সিক্রেট চ্যাট’-এর মাধ্যমে পারস্পরিক যোগাযোগ করতেন। তাঁদের আসামি করে রাজধানীর ভাটারা থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা করা হয়েছে। ওই মামলায় তাঁদের পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

গ্রেপ্তার জঙ্গিদের পরবর্তী মিশন সম্পর্কে জানতে চাইলে সিটিটিসি প্রধান কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্ত ও নিরাপত্তার স্বার্থে ‘উলফ প্যাক’-এর হামলা পরিকল্পনার বিস্তারিত তথ্য এখনই প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তাদের কাছ থেকে এমন কিছু বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে সম্প্রতি খামারবাড়ি ও পল্টন এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া আইইডির মিল রয়েছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি।’

তিনি বলেন, ‘এদের মধ্যে শিবলী শাহাজাদ (আত্মঘাতী) হামলার পরিকল্পনা করেছিল। এ লক্ষ্যে সে আইইডি (হাতে তৈরি বোমা) তৈরির কিছু সরঞ্জাম জোগাড় করেছিল। সম্প্রতি (২৩ জুলাই) খামারবাড়ি ও পল্টন এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া আইইডিতে গ্যাসের এক ধরনের ক্যান ব্যবহৃত হয়েছিল। এ ধরনের চারটি কনটেইনার শিবলী শাহাজাদ সংগ্রহ করেছিল। ওই ঘটনার সঙ্গেও এই পাঁচজনের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি।’

সিটিটিসি সূত্র জানায়, অনলাইনের বিভিন্ন সাইটে ঢুকে সেলফ মটিভেটেড হয়ে পরবর্তী সময়ে এই লোন উলফ সদস্যরা বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে জোটবদ্ধ হয়, যাদের কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন বা নেতা নেই। এই কৌশলে অনেক আগে থেকেই জঙ্গিরা বিভিন্ন দেশে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। মনিরুল বলেন, ‘সাধারণত সেনাবাহিনীতে এই কৌশলের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে।’

পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারদের মধ্যে শিবলী একটি ইস্তেহাদি হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আবাবিল ছিলেন তাঁদের আধ্যাত্মিক নেতা। বিশেষ পরিকল্পনা করে তাঁরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজ করতেন। এই হামলা চালাতে যে অর্থ লাগত ‘ডার্ক ওয়েব’ থেকে তা সংগ্রহের চেষ্টা করছিলেন। পুলিশের কাছে অর্থ সংগ্রহের সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য-প্রমাণও রয়েছে। শিবলী ২০১৪ সাল থেকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ। কলাবাগান এলাকার আলামিন মসজিদে তিনি এর আগে অন্য জঙ্গিদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। মর্তুজার সঙ্গে আড়াই মাস আগে বারিধারা এলাকায় তাঁর পরিচয় হয়। মাশরিক ও মর্তুজা দীর্ঘদিনের বন্ধু।

সিটিটিসি সূত্র আরো জানায়, গ্রেপ্তারদের মধ্যে মাশরিক আহমেদের দায়িত্ব ছিল সীমান্তপথে অস্ত্র সংগ্রহ করা। তিনি যশোরের বাসিন্দা। এ ছাড়া তারেক ও তাসনিম রিফাত মূলত সদস্য সংগ্রহের কাজ করতেন। এই পাঁচজনের সঙ্গে আরো কিছু নাম পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেপ্তার করতে পারলে পুরো গ্রুপটি সম্পর্কে জানা যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *