উত্তরার ফুটপাতে চাঁদাবজি (১)

বাংলাদেশ

আজমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে পশ্চিমে রবীন্দ্র সরণি পর্যন্ত সড়কের ফুটপাতের ওপর বসানো হয়েছে প্রায় দুই হাজার অবৈধ দোকান। ফুচকা থেকে চা, ফল থেকে মনিহারি, কাপড় থেকে জুতা, আরো কত কী। উত্তরার ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আফসার উদ্দিন খানের আয়ের প্রধান উৎস এসব দোকান থেকে তোলা চাঁদা। এলাকার সাধারণ মানুষ জিম্মি এই কাউন্সিলরের কাছে। ফুটপাত থেকে তাঁর হয়ে চাঁদা আদায়ের টাকা জিম্মায় থাকে কৃষক নেতা রাসেল মণ্ডলের কাছে। পরে রাসেল ভাগের টাকা পৌঁছে দেন আফসার উদ্দিন খানকে। সেই সুবাদে একসময়ের ফুটপাতের হকার রাসেল মণ্ডলও বর্তমানে বেশ বিত্তবান। রাসেল মণ্ডলের দপ্তরে থাকা আফসার উদ্দিন খানকে ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নেওয়া রাসেল মণ্ডলের ছবি এ দুজনের ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ দেয়।

ফুটপাতজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসানো এসব অবৈধ দোকানের কারণে অভিজাত এই এলাকার আভিজাত্য অনেকটা লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে। ওই এলাকায় বসবাসকারী ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোরের প্রভাতকে বলেন, ‘আমার বাড়ির গেটের ফুটপাতেই অবৈধ দোকান বসানো হয়েছে। মাঝেমধ্যে সিটি করপোরেশনের লোকেরা এসে তুলে দেয়। ঘণ্টাখানেক পর ওরা এসে আবার বসে। শুনেছি, এই দোকানিদের কাছ থেকে কেউ কেউ চাঁদা নেয়। সিটি করপোরেশন আসলে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।’

ফুটপাত থেকে অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করতে সিটি করপোরেশন কি ব্যর্থ? এমন প্রশ্ন করা হলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম ভোরের প্রভাতকে বলেন, ‘আমরা উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে দোকান সরিয়ে দিয়ে আসি। কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যে ওরা আবার এসে বসে। সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে এই উচ্ছেদ সম্ভব নয়। থানা-পুলিশেরও দায় আছে। দায় আছে স্থানীয় কমিউনিটি ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরের। সবাই আন্তরিক হলেই কেবল কাজটা করা সম্ভব।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আজমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে পশ্চিমে রবীন্দ্র সরণি পর্যন্ত এলাকায় প্রায় দুই হাজার দোকান বসানো হয়েছে। এই দোকানগুলো থেকে প্রকারভেদে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়

করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা, দোকানদার ও চাঁদা আদায়কারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গড়ে ৩০০ টাকা করে চাঁদা আদায়ে প্রতিদিন এই এলাকা থেকে অন্তত ছয় লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।

ওই এলাকার এসব অবৈধ দোকান থেকে চাঁদার টাকা তোলে দুই দুলাল। স্থানীয়ভাবে এরা পরিচিত চিকন দুলাল ও মোটা দুলাল নামে। সুমন নামে (ছদ্মনাম) ফুটপাতের এক কম্বল বিক্রেতা ভোরের প্রভাতকে বলেন, ‘আমি প্রতিদিন ৩০০ টাকা চাঁদা দেই। পালাক্রমে কখনো চিকন দুলাল আবার কখনো মোটা দুলাল এসে চাঁদার টাকা নেয়। তবে ওই টাকা জমা হয় রাসেল মণ্ডলের কাছে।’

জোড়া দুলালদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তবে স্থানীয় লোকজন জানায়, ক্ষমতাসীন দলের মিটিং-মিছিলে এদের উপস্থিতি দেখা যায়। আর এখানকার চাঁদাবাজির মূল নিয়ন্ত্রক সাবেক হকার লীগ, বর্তমানে কৃষক লীগ উত্তরা পূর্ব থানার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাসেল মণ্ডল। উত্তরা ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আফসার উদ্দিন খানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ তিনি। আফসার উদ্দিন খানই তাঁর আশ্রয়দাতা।

ওই এলাকায় চাঁদা তোলার সময় দেখা পাওয়া যায় মোটা দুলালের। চাঁদা তুলতে দেখা গেলেও সে ভোরের প্রভাতকে কাছে বেমালুম অস্বীকার করে বলে, ‘আমি চাঁদা তুলি না।’

রাসেল মণ্ডলের আশ্রয়দাতা আফসার উদ্দিন খান ভোরের প্রভাতকে বলেন, ‘দলের সবাই আমার ঘনিষ্ঠ। আমি কোনো চাঁদাবাজির ভাগ নেই না। আমি বরং ফুটপাত থেকে দোকান তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

কিন্তু আপনার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ফুটপাতেই সবচেয়ে বেশি অবৈধ দোকান বসানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলছে এসব দোকান এবং আপনার ঘনিষ্ঠজনরাই ফুটপাত থেকে চাঁদা তুলছে। এমন কথার জবাবে আফসার খান বলেন, ‘আগেই বলেছি, দলের সবাই আমার ঘনিষ্ঠ। ফুটপাতে দোকান আছে এটাও ঠিক, তবে এখন আর থাকবে না। আমি আফসার উদ্দিন খান। আমার ফুটপাতের টাকার প্রয়োজন হয় না।’

চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে রাসেল মণ্ডল বলেন, ‘চাঁদাবাজি নিয়ে আমাকে সবাই দায়ী করে। অথচ আমি ব্যবসা করি। আমি চাঁদাবাজি করি না, এটা কাউকে বোঝাতে পারছি না। আমি বারবার বলছি, আফসার উদ্দিন খান আমার ঘনিষ্ঠজন, তিনি আমার নেতা। তবে আমি তো তাঁকে চাঁদার টাকার ভাগ দেই না। আমার একটা গেঞ্জির ফ্যাক্টরি আছে গাজীপুরে। সেই গেঞ্জি উত্তরায় এনে বিক্রি করি।’

কিছুদিন আগে উত্তরার ফুটপাতে হকারি করতেন, গেঞ্জি ফ্যাক্টরি করার মতো টাকা কোথায় পেলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে নিশ্চুপ থাকেন রাসেল মণ্ডল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *