অনেক খুঁজে মিলল এনআইসিইউ, তবুও হল না শেষ রক্ষা

স্বাস্থ্য

ঢাকার মনিপুরীপাড়ায় ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৩৪ দিনের শিশু মুসা মাহমুদকে হারানোর এই বিবরণ দিয়েছেন তার মা সানজীদা আলম আঁখি।

তিনি বৃহস্পতিবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বেঁচে থাকলে শুক্রবার তার ছেলের বয়স হত ৪০ দিন। তার বাবার বাড়ি পুরান ঢাকার রেওয়াজ অনুযায়ী শুক্রবারই ছেলের প্রথম নানাবাড়ি যাওয়ার কথা ছিল।

“তার ও তার বাবার জন্য একই রঙের পাঞ্জারি বানানো হয়েছিল। আমার খালারা তার জন্য নানা জামা-জুতা রেডি করে রেখেছিল। কাল সেখানে গেলে তাকে অভ্যর্থনা জানাবে। কিন্তু কাল সেখানে তার জন্য মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। ডেঙ্গু আমার ছেলেটাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে গেল। রঙিন কাপড়ের বদলে তাকে সাদা কাফনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে নানাবাড়িতে।”

গত শনিবার বনশ্রীর আল রাজী হাসপাতালে মারা যায় মুসা। অপর একটি হাসপাতাল তাকে আইসিইউ সাপোর্টের জন্য অন্য কোথাও নিতে বললে অনেক খোঁজাখুঁজির পর সেখানেই একটি সিট পেয়ে আগের দিন নিয়েছিলেন বাবা-মা।

আঁখি জানান, মুসা জন্মের সময় স্বাভাবিক ছিল। ওজন ছিল প্রায় তিন কেজি। বয়স এক মাস হওয়ায় ছেলের অবস্থা পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলেন সব কিছু ঠিক আছে কি না।

“১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার বিকেলে ফার্মগেটের মনিপুরীপাড়ায় সুর্যের হাসি ক্লিনিকে গেলাম। সেখানে তার ওজন টেস্ট করালাম। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সব কিছু ঠিকই পেলাম। কিন্তু তার গা কিছুটা গরম ছিল, তাপমাত্রা ছিল ৯৯ ডিগ্রি। স্বাস্থ্যকর্মীরা বলল, তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রির বেশি হলে পরীক্ষা করাতে। একটা নাপা সিরাপ দিয়ে বলল, তাপমাত্রা বেশি হলে খাওয়াবেন।”

সেদিন রাত ২টার দিকে মুসার ১০২ ডিগ্রি জ্বর ওঠে বলে জানান আঁখি। শুক্রবার সকাল ৮টায় তাকে মগবাজার আদ দ্বীন হাসপাতালে নিয়ে যান।

“ডেঙ্গুর কোনো লক্ষণ দেখা না গেলেও আশঙ্কা থেকেই তার রক্ত পরীক্ষা করেন তারা। দুপুর আড়াইটায় রিপোর্ট আসলে দেখা গেল, তার ডেঙ্গু এনএস১ পজিটিভ। প্লাটিলেট নেমে এসেছে ২৭ হাজারে। তারা বলে তাদের ওখানে এনআইসিইউ সাপোর্ট নেই। এনআইসিইউ সাপোর্ট আছে এমন হাসপাতালে নিয়ে যেতে।”

এরপর ছোট্ট ছেলেটিকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান, কিন্তু সেখানেও এনআইসিইউ সিট খালি ছিল না।

সানজীদা আলম আঁখি বলেন, অনেক খোঁজাখুজি করে শেষ পর্যন্ত বনশ্রীর আল রাজি হাসপাতালের এনআইসিইউতে একটা সিট পান তারা।

“সেখানে গেলে চিকিৎসকরা বললেন, আমার বাচ্চা শকে চলে গেছে। তাকে বাঁচানো সম্ভব না। তার পরিস্থিতি খারাপের দিকে চলে গেছে। এরমধ্যে তাকে প্লাটিলেট দেওয়া হল। সেদিন রাত ১২টার আগে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হল। পরদিন সকাল ১০টার দিকে মারা যায় মুসা।”

মৃত্যুর পর মুসার মরদেহ নেওয়া হয় পুরান ঢাকায় আঁখির বাবার বাড়িতে। সেখান থেকে আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

আঁখি অভিযোগ করেন, তাদের এলাকা পরিচ্ছন্ন। কিন্তু কখনও ওই এলাকায় মশার ওষুধ ছিটাতে দেখেননি তিনি।

“যখন ডেঙ্গু রোগী আসার খবর পাওয়া যাচ্ছিল তখনই তা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল।”

কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতেই ডেঙ্গুর এই অবস্থা দেখা দিয়েছে দাবি করে এই মা বলেন, “আজ জ্বরে আক্রান্ত মেয়েকে নিয়ে আদ দ্বীন হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানেও দেখলাম অনেক শিশু জ্বর নিয়ে এসেছে। হাসপাতালে জায়গা দেওয়া যাচ্ছে না। বেশিরভাগই ডেঙ্গু রোগী।

“আমার মনে হয়, সরকার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সেভাবে পদক্ষেপ নেয়নি। সময়মতো নিয়ন্ত্রণ করলে ডেঙ্গুর প্রকোপ এতটা বাড়ত না। এজন্য সরকার আরও পদক্ষেপ নিক, আমি চাই না আমার মতো আর কোনো মায়ের কোল খালি হোক।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *